অনুবাদ গল্পঃ লা মিজারেবল- ভিক্টর হুগো -০৪

তৃতীয় পর্বের পরঃ

ফ্রান্সের একটি শহর এম্‌সুরেম। নকল চুনির ব্যবসায়ের জন্য সে সময় সারা ইউরোপে শহরটির বেশ খ্যাতি ছিল।

 

১৮১৫ সালের শীতের একটি রাত। শহরে সে রাতের দারুণ সোরগোল কারন, শহরের টাউন হলে আগুল লেগে গেছে। সেই আগুনের শিকার হয়েছে লোকজন। ছোটাছুটি, চিৎকার আর আর্তনাদে সেই এলাকায় যেন এক  প্রলয়কান্ড ঘটে যাচ্ছে। জামায়েত লোকজনের মধ্যে একজন সেই আগুনের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। লোকটির সাজপোশাক শ্রমিকের মতো। আগুনের মধ্য থেকে লোকটি পুলিশের বড় কর্তার দু’ছেলেকে উদ্ধার করলেন। পরে জানা গেল– লোকটি এ শহরে নতুন এসেছে। তিনি এ শহরের বাসিন্দা নন। তার নাম ফাদার মাঁদলেন। বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। মাথার চুলে পাক ধরেছে।

শহরে আগমনের সাথে সাথেই ফাদার মাঁদলেন শহরের বাসিন্দাদের কাছে পরিচিত হয়ে গেলেন। এমন একজন আত্নত্যাগী লোক সম্পর্কে শহরের লোকজনের মধ্যে তখন কোন প্রশ্নো দেখা দিল না। কেউ যানতেও চাইলো না যে, লোকটি কে, কোথা থেকে এসেছে? ফাদার মাঁদলেন সেই শহরে বসবাস শুরু করলেন। সামান্য পুঁজি নিয়ে ইমিটেশন চুনির একটা কারবারো খুলে বসলেন।

দিনের পর দিন যায়। ফাদার মাঁদলেনেরও দিন বদল হচ্ছে। তাঁর ছিল অপূর্ব কর্মশক্তি। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি তাঁর কারবারের অবস্থা পাল্টে ফেললেন। তিনি ইমিটেশনের চুনি প্রস্তুতের উন্নতর এক রাসায়নিক প্রকৃয়া বের করলেন। তাঁর কারখানার চুনি সবার উপরে টেক্কা দেয়া শুরু করলো। সাধারণ লোক তো দূরে থাক, পাকা জহুরীও অনেক সময় তাক্‌ লেগে যেত– এ আসল চুনি, না নকল চুনি! দেখতে-দেখতে সবখানে তাঁর কারখানার চুনির নাম ছড়িয়ে পড়লো।

ফাদার মাঁদলেনের কারখানা দিন-দিন বড় হতে লাগলো, কারবার ফুলে ফেঁপে উঠলো। এর সাথে-সাথে ফাদার মাঁদলেন তাঁর চুনির দাম কমিয়ে দিলেন আর কারখানার কারিগরদের মজুরী দিলেন বাড়িয়ে। কারবার শুরু করবার বছর পাঁচেকের মধ্যে তিনি বিপুল অর্থের অধিকারী হলেন। নকল চুনির ব্যবসাটি তিনি প্রায় একচোটিয়া করে ফেললেন। সারা ইউরোপে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লো।

কতো টাকা পয়সার মালিক যে তিনি হলেন, কিন্তু তাঁর মনে একটুও দেমাগ নেই। সাদাসিধে চালচলন। চুলগুলো তাঁর সাদা হয়ে গেছে। চেহারা দেখতে খানিকটা শ্রমিকের মতো। গম্ভীর্যময় মুখমন্ডল। কিন্তু যখন হাসেন, তখন প্রান খুলে হাসেন। লোকজনের সাথে তিনি খুব একটা মেশেন না। নীরবে কাজ করে যান। কোথাও বসে তিনি আসর জমান না, তার কোন তন্তরঙ্গ বন্ধু আছে বলেও মনে হয় না। মাঁদলেন প্রতি সন্ধায় বাইরে ঘুরতে বের হন। যখন পথ চলেন, তখন মনে হয় যেন কোন এক সুদূর অতীত চেতনাকে নিবন্ধন করে তিনি চলেছেন। তাঁকে দেখে মাঝে-মাঝে মনে হয় —তিনি যেন পাথারে খোদাই করা এক দার্শনিকের প্রতিচ্ছায়া। পরনে সাধারণ মোটা লম্বা কোট। তাতে গলা পর্যন্ত বোতাম লাগানো, মাথায় একটি মোটা টুপি– এই হলো তাঁর পোশাক। যখন বাইরে বের হোল তখন হাতে থাকে বন্দুক। আড়ম্বর নেই, বিলাসিতা নেই, কোন কিছুই নেই। অতি সাধারণ ফাদার মাঁদলেনের জীবল-যাত্রা। তাঁর বিশ্রামের শয়নকক্ষটিও নিরাভরণ। শুধু দুটি সেকেলে ধরনের রুপোর বাতিদান ছাড়া তাঁর ঘরে আর তেমন আসবাব-পত্র নেই। তাঁর বাড়িতে একটি ছোটখাটো বই-এর সংগ্রহশালাও রেখেছেন। কাজের পাশাপাশি অবসর সময়ে তিনি বই পড়তে ভালোবাসতেন।

এ বয়সেও দেহে তাঁর যেন দৈত্যের মত বল। রাস্তা দিয়ে চলছেন ফাদার মাঁদলেন, দেখলেন কারো ঘোড়া ক্লান্ত হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গেছে। তিনি গিয়ে তুলে দিলেন। ক্ষ্যাপা ষাঁড় ছুটছে, কেউ সাহস করে পাগলা ষাঁড়কে ঠেকাতে সামনে এগোচ্ছে না, প্রান ভয়ে সবাই এধার-ওধার ছুটছে। তিনি ষাঁড়কে ঠেকালেন। বাগে নিলেন ষাঁড়ের শিং দু’টো ধরে, তাকে প্রায় নিশ্চল করে ফেললেন। এ সময়ও তার দেহে এমনি বল।

ছোট-ছোট ছেলেমেয়েরা ফাদার মাঁদলেনের দারুন ভক্ত। ফাদার মাঁদলেন বেরুবার সময় পকেট ভর্তি খুচরা টাকা নিয়ে বেরুতেন। মাঝে-মাঝে শহরের বাইরে গ্রামেরর দিকে বেড়াতে যেতেন তিনি। তাঁকে দেখলেই গরীব ছেলেমেয়েদের মধ্যে হৈ-চৈ পড়ে যেত। তাঁকে ঘিরে দাঁড়াতো ছেলেমেয়েরা। তাদের তিনি পয়সা দিতেন। গ্রামের লোকজনদের কাছে ফসলের খবরা-খবর জিজ্ঞেস করতেন তিনি। এটা-ওটা উপদেশ দিতেন । দেখে শুনে মনে হতো, তিনি বোধহয় একজন অভিজ্ঞ চাষি এবং দীর্ঘদিন তিনি গ্রামে কাটিয়েছেন। কিন্তু কেউ তাকে কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেতো না। সবার খবরা-খবর তিনি নিতেন, কিন্তু কারও সাথে বড় বেশি মিশতেন না। শহরের ছেলেমেয়েরাও তাকে খুব ভালোবাসতো। তাদেরকেও তিনি খেলনা, চকলেট, ছবি খাবার দিতেন।

শহরের যে এলাকায় ফাদার মাঁদলেন বাস করতেন সেইখানে একটি হাসপাতাল ছিল। হাসপাতালটির জীর্ন অবস্থা। টাকার কারনে কাজ খুব একটা এগুচ্ছিলো না। তিনি টাকা-পয়সা দিয়ে হাসপাতালটির কাজকর্ম আবার চালু করলেন। হাসপাতালে আরও দশটি বেড বাড়ানো হলো। এই বাড়তি খরচও মাসে-মাসে ফাদার মাঁদলেন বহন করতে লাগলেন। তাঁর বাড়ির পাশে একটি মাত্র স্কুল ছিল। কিন্তু তাও অত্যান্ত জীর্ণ, হতশ্রী অবস্থা। ফাদার মাঁদলেন ছেলেমেয়েদের জন্য একটি স্কুল স্থাপন করলেন। দু’টো নতুন সুন্দর দালান তৈরি করে দিলেন। শিক্ষকদের বেতর বাড়িয়ে দিলেন। তিনি বৃদ্ধ ও পঙ্গু শ্রমিকদের সাহায্যের জন্য একটি সমবায় তহবিল গঠন করলেন। শ্রমিকদের জন্যে একটি দাতব্য চিকিৎসালয়ও স্থাপন করলেন।

এত দান-খেয়ারত করেন। এত টাকা-পয়সা এ নিয়ে ফাদার মাঁদলেনের কোন রকম দম্ভ নেই। নিজেকে নিয়ে গর্ব করার সামান্য প্রচেষ্টাও তাঁর রয়েছে বলে মনে হয় না। তার লোকজনের সেবা? সেবাকে তিনি জীবনের ব্রত হিসেবেই গ্রহন করেছেন।

শহরের সাধারণ লোকজনের এই প্রিয় মানুষটির জীবন এমনিভাবেই কেটে যাচ্ছিল। শহরের লোকজন তাঁকে শ্রদ্ধা করে ডাকে মঁসিয়ে মাঁদলেন। কিন্তু শ্রমিক, কারিগর ও ছোট-ছোট ছেলেমেয়েদের কাছে তিনি ফাদার মাঁদলেন, প্রিয় মাঁদলেন। লোকজনদের সেবা করেন, দান-খেয়ারত করেন, শ্রমিক, কারিগরদের মঙ্গলের কথা চিন্তা করেন, তাঁর উদ্দেশ্য কি? এ নিয়ে কারো-কারো দারুন মাথা ব্যথা শুরু হলো। মাঁদলেন যখন প্রথম কারবার শুরু করেছেন, কারবারের পিছনে অসম্ভব খেটেছেন তখন লোকজন বলতেন, — মাঁদলেন বড়লোক হতে চায়। কিন্তু যখন তারা দেখলেন যে, ফাদার মাঁদলেন নিজে বড় লোক হওয়ার জন্য নয়– অন্যকে সচ্ছল করে বড় করে তুলতে চাচ্ছেন, বিত্তহীন্দের রুজি-রোজগারের সুযোগ দিচ্ছেন, তিনি আসার পর শহরের শ্রমিক ও কারিগরদের অবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভাল হয়েছে, কারবারে ঠিকমত টিকে থাকার জন্য ফাদার মাঁদলেনের দেখাদেখি অন্যান্য ব্যবসায়ীরা শ্রমিক ও কারিগরদের মজুরী কিছু না কিছু বাড়িয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন।

ফাদার মাঁদলেন আসার পর শহরটি আগের চেয়ে অনেক প্রানবন্ত হয়ে উঠেছে– তখন লোকজন বলা শুরু করলেন, –ফাদার মাঁদলেন খ্যাতির কাঙ্গাল, কারবার ভালো করে বাগিয়ে বসেছে। এখন একটু যশের প্রয়োজন, প্রতিপত্তির প্রয়োজন। ফাদার মাঁদলেন তাই চান।

তবে যাই হোক ফাদার মাঁদলেন এ শহরে আসার পর থেকে এক ভদ্রলোকের চোখের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছে। তিনি হলেন ঐ প্রদেশের সংসদের সদস্য। যারা একটু অপরিচিত একটু আধটু সমাজহিতকর কাজ করতেন, তাদের সবাইকে তিনি প্রতিদ্বন্দী বলে সন্দেহ করতেন। ফাদার মাঁদলেন দেখে তিনি ভাবলেন নির্ঘাত সংসদের সদস্য হতে চান। তাই সদস্য ভদ্রলোকও আদা-জল খেয়ে লেগে গেলেন। শহরের হাসপাতালে তিনিও কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে সাহয্য করলেন। বাড়তি দু’টো বিছানার ব্যবস্থা করে দিলেন। ধর্মের প্রতি সদস্য ভদ্রলোকের এমনিতে কোন আস্থা ছিল না। যারা ধর্মীও আচার অনুষ্ঠান করতেন, তাদেরকে বরঞ্চ তিনি করুনার চোখে দেখতেন। এদিকে ফাদার মাঁদলেন প্রতি রবিবার নিয়মিত গীর্জায় যান। বাইবেলের নির্দেশ অনুসারে জীবন নির্বাহের চেষ্টা করেন। ভীষন ভাবনায় পরে গেলেন ভদ্রলোক। তারপর তিনি ভোল পালটে ফেললেন আর যাই হোন, নির্বাচনে মাঁদলেনকে হারাতেই হবে। মাঁদলেনের দেখাদেখি তিনিও দু’বেলা গীর্জায় যাওয়া শুরু করলেন।

দেখতে-দেখতে বছর চারেক কেটে গেল। ১৮১৯ সালের দিকে এমসুরেম শহরে এ-কান থেকে ও-কানে একটি খবর ছড়িয়ে পড়লো। কি বৃত্তান্ত? না, রাজা নাকি স্থির করেছেন– ফাদার মাঁদলেনকে এমসুরেম শহরের মেয়র হিসাবে মনোনয়ন দেবেন।

ফাদার মাঁদলেনের ইচ্ছাটা কী, এ নিয়ে চিন্তায় যাদের খাদ্য মুখে উঠছিলো না, তারা এবার উল্লাসিত হয়ে উঠলেন। তারা বলাবলি শুরু করলেন– কি, আগেই তো বলেছিলাম যে, ঐ ফাদার মাঁদলেন একটু খ্যাতি আর প্রতিপত্তি চায়। এবার দেখলে তো!

শহরের লোকজন খবরটা কোথেকে পেয়েছিল জানি না, কিন্তু এই মুহুর্তে এটাকে গুজব বলা একদমই ভুল হবে। সত্যি-সত্যি রাজা ফাদার মাঁদলেনকে মেয়র হিসাবে নিযুক্ত করতে চাইলেন। সরকারি গেজেটে তার নাম ছাপা হলো।

কিন্তু ফাদার মাঁদলেন রাজার এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। যারা তার সমালচনা করছিল, তাঁরা একেবারে ‘থ’ হয়ে গেল।

নকল চুনি প্রস্তুতের যে আধুনিক পদ্ধতি ফাদার মাঁদলেন আবিষ্কার করেছিলেন; সেবছর শিল্প প্রদর্শনীতে তা দেখানো হলো। চুনি বিশেষজ্ঞগন পদ্ধতিটির প্রচুর প্রশংসা করলেন। ফাদার মাঁদলেনের এই কৃতিত্বের জন্য রাজা তাকে বিশেষ উপাধি দান করলেন। এই দেখে সমালচকেরা আবারও বলে উঠল– মাঁদলেন তাহলে এই উপাধিটি পাওয়ার জন্যই এত প্রচেষ্টা করছিল। কিন্তু মাঁদলেন যখন খেতাব প্রত্যাখ্যান করলেন, তখন তারা রীতিমত হতবুদ্ধি হয়ে পড়লেন। ব্যপার কি। ফাদার মাঁদলেনের ইচ্ছেটা কি?  কেউ-কেউ বলাবলি শুরু করলেন, –দেমাক, স্রেফ দেমাক। মাঁদলেন এখুন ধরাকে সরা জ্ঞান করছে।

কেউ-কেউ বললেন, — ফাদার মাঁদলেন অত অল্পতে তুষ্ট নয়। শুধু মেয়র করলেই চলবে না– মাঁদলেন ক্রশ চায় ক্রশ, কিন্তু ফাদার মাঁদলেন যখন ক্রশ গ্রহনেও অসম্মতি জানালেন, তখন সবাই ভীষণ আশ্চর্য হয়ে গেলেন। মাঁদলেন তাহলে কি চান? লোকটা কি খেয়ালী?

এদিকে সমাজের বিশেষ শ্রেণীর লোকজন তাঁর দিকে ঝুকে পড়লেন। নানা জায়গা থেকে তাঁর নিমন্ত্রন আসা শুরু করলো। একদিন যারা ফাদার মাঁদলেনকে দু’চোখে দেখতে পারতেন না, তাঁদেরই কেউ-কেউ এগিয়ে এলেন সখ্যতা করার জন্য। ধনবান ফাদার মাঁদলেনের কারবারে দেশের বড়-বড় ধনীরা তাদের টাকা খাটানোর আমন্ত্রন জানালেন। কিন্তু ফাদার মাঁদলেন এসব আমন্ত্রণও গ্রহন করলেন না। ব্যর্থ হয়ে তারা সবাই বলাবলি শুরু করলেন,– কোথাকার না কোথাকার লোক এই মাঁদলেন! একেবারেই গেঁয়ো! ভদ্রতা জানে না, বকলম, একটি বেনে– ইত্যাদি। এসব কথায় ফাদার মাঁদলেন অবশ্য কোন আমল দিতেন না।

দেশের রাজা কিন্তু ভুললেন না। পরের বছর অর্থাৎ ১৮২০ সালে তিনি আবার ফাদার মাঁদলেনকে এমসুরেম শহরের মেয়র হওয়ার আমন্ত্রন জানালেন। ফাদার মাঁদলেন এবারও রাজি হলেন না। কিন্তু রাজা এবার কোন কথায় শুনতে রাজি নন।

তিনি বললেন,– দেশের ও দেশের কল্যানের জন্য ফাদার মাঁদলেনের আরো সাহায্যের প্রয়োজন রয়েছে। সুতরাং আর কোন কথা নয়, রাজি আপনাকে হতেই হবে।

এদিকে ফাদার মাঁদলেনের কারখানা-বাড়ির সামনে এসে জনগণ ভিড় জমিয়ে দাবী জানানো শুরু করলো– ফাদার মাঁদলেনকে মেয়র হতেই হবে। দেশের বড়-বড় লোকেরা, সমাজের উঁচু বংশের লোকেরাও তাঁকে অনুরোধ জানালেন।

সবাই চেঁচিয়ে বলল, –মঁসিয়ে মাঁদলেন, আপনি দয়া করে মেয়র পদ গ্রহণে সম্মত হোন। আপনি কি জনগনের মঙ্গল চান না? মেয়র যদি একজন সৎ, জ্ঞানবার ও কর্মনিষ্ঠ লোক হয়, তবে জনসাধারণের ভীষণ উপকার হয়, আমাদের সেই উপকার করার যোগ্যতা আমাদের আছে মঁসিয়ে। এতে অসম্মতি জানিয়ে আপনি আমাদের অপকার বা অপমান করতেন পারবেন না।

এতে লোকের অনুরোধ উপেক্ষা করা গেল না। এমসুরেম শহরের মেয়রের দায়িত্ব নিতে তিনি রাজি হয়ে গেলেন। কিন্তু মেয়র হয়েও সেই আগের মতোই রয়ে গেলেন তিনি। ব্যক্তিগত কাজ সেরে আগের মতই বিভিন্ন জনকল্যানকর কাজেই নিজেকে মগ্ন রাখতেন।

ও মঁসিয়ে মাদলেনের আরেকটি অভ্যাসের কথা এখানে অবশ্য বলতে ভুলে গেছি। অল্প বয়সী ছেলেরা বিশেষ করে যারা গান গেয়ে পয়সা রোজগার করে বেড়ায়, কিংবা যারা দেশে-দেশে ঘুরে বেড়ায় ও চিমনি পরিষ্কার করে, তাদেরকে দেখতে পেলেই মঁসিয়ে মাদলেন কাছে ডাকতেন। তাদের নাম-ধাম, এ-কথা, সে-কথা জিজ্ঞেস করতেন। পরে টাকা-পয়সা দিয়ে বিদায় করতেন। কালক্রমে একথা বিভিন্ন শহরে জানাজানি হয়ে গেল। অনেক ছেলে টাকা-পয়সা পাবে এমন লোভে এমসুরেম শহরে মঁসিয়ে মাঁদলেনের নজরে পড়ার চেষ্টা করতে লাগল।

মেয়র মাঁদলেনের যোগ্য পরিচালনায় এমসুরেম শহরের দিন-দিন শ্রীবৃদ্ধি হতে লাগল। সবার উপার্জন আগের চেয়ে বেড়ে গেল। সরকারের রাজস্ব আদায়ের অসুবিধা কমে গেল। রাজস্ব আদায়ের আগে যে টাকা খরচ হতো, তার চার ভাগের একভাগ খরচ কমে গেল। এতে সবাই মেয়েরের প্রতি খুশি হলো এবং সারা শহর তাঁর প্রশংসায় মুখরিত হলো।

আর এভাবেই এমসুরেম শহরের অবস্থা আগের চেয়ে ভালো হয়ে গেল। আর সারা শহর জুরেই একধরনের শান্তি বিরাজ করতে লাগলো।

(চলবে)

আগের পর্বসমুহঃ

লা মিজারেবল – ০১

লা মিজারেবল – ০২

লা মিজারেবল – ০৩

 

টি মন্তব্য

You may also like...

Skip to toolbar