অনুবাদ গল্পঃ লা মিজারেবল- ভিক্টর হুগো

পর্ব-০১

  ১৮০০ শতাব্দী। দক্ষিন ফ্রান্সের ব্রাই প্রদেশ। এই প্রদেশের ছোট্ট একটি কুটির থেকে শুরু হচ্ছে আমাদের এই কাহিনী। ব্রাই প্রদেশে এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়েছিল একটি শিশু। নাম জাঁ ভালজাঁ। ভালজাঁর বাবা ছিল বড্ড গরীব। স্ত্রী, ভালজাঁ আর এক মেয়ে – এই নিয়ে ছোট সংসার। মেয়েটির বিয়ে হয়েছিল; তবু এই ছোট্ট সংসারে ভরণপোষণের ব্যাপারেই ভালজাঁর বাবা হিমশিম খেয়ে যেত।

জাঁ ভালজাকে ছোট রেখে তার মা অসুস্থ হয়ে মারা যায়। অভাবে বিনে চিকিৎসায় তার মৃত্যু হয়েছিল। বাবা ছিল কাঠুরে। স্ত্রীর মৃত্যুর পর ক’দিন পর গাছ থেকে পরে গিয়ে সেও মারা গেল। সংসারে আপন বলতে একমাত্র বোন ছাড়া জাঁ ভালজাঁর তখন আর কেও নেই। অসহায় ভালজাঁ বোনের সংসারে আশ্রয় পেল। দারিদ্র আর দুর্বিপাকে জাঁ ভালজাঁর কোন লেখাপড়া শিখা হয়নি। বোনের সংসারে উঠে সে সামন্য কিছু রোজগার করতে শুরু করলো এবং এভাবেই তার দিন চলতে লাগলো।

ভালজাঁর বয়স যখন পঁচিশ। কয়েকদিনের অসুখে হঠাৎ তার বোনের স্বামী অর্থাৎ তার ভগ্নিপতি মারা গেল। ভগ্নিপতি আর ভালজাঁর আয়ে সংসারটি কোন রকম চলে যেত। ভালজাঁ দিন মজুরি করে সামান্য কিছু রোজগার করতো। এবার ভগ্নিপতির মৃত্যুতে ভালজাঁ যেন সমুদ্রে পড়ল। বিধবা বোন আর ছোট-ছোট সাতটি ছেলেমেয়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব তাকে মাথা পেতে নিতে হল। ভাগ্নেদের মধ্যে সবচেয়ে বড়টির বয়স তখন মাত্র আট।

যৌবনের সব স্বপ্নসাধ প্রায় বিলীন হয়ে গেল ভালজাঁর। সংসার চালাবার জন্য সে কঠোর পরিশ্রম করছে। তবু দু’বেলা খাবার জোটে না। ফ্রান্সে তখন খাদ্যের চড়া দাম ও বড্ড অভাব।

বোন আর ভাগ্নে-ভাগ্নিদের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য ভালজাঁর সব দুঃখ-বেদনা হাসিমুখে সহ্য করে যায়। বাবার পেশা গাছ কাটার কাজকেই বেছে নিয়েছিল ভালজাঁ। তার বোনও টুকটাক কাজ করতে শুরু করলো। কিন্তু দুজনের যা রোজগার, তাতে দু’বেলা খাবার জোটে না। দিনমজুরি, খেতে-খামারে কাজ, ঘাস শুকানো, গরু চরানোর বাড়তি কাজ শুরু করল ভালজাঁ। এতে সামান্য কিছু রোজগার বাড়লো কিন্তু অবস্থার তেমন কোন হেরফের হলো না। এদিকে বোনও কেমন সব দিন-দিন স্বার্থপর হয়ে উঠেছে। ভালজাঁর রোজগারে সব পয়সা হাতিয়ে নেয়ার  তার চেষ্টা। ভালজাঁরও তা’ নজর এড়ায় না। আগের মত আন্তরিকতা বোনের নেই। ভালজাঁ এর কোন প্রতিবাদ করে না। এদিকে অভাব দিন-দিন বেড়েই চলেছে। অশান্তি বাড়ছে। কঠোর পরিশ্রম, অভাব-অনাটনে ভালজাঁর মাথা ঠিক রাখাই দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সেবার দক্ষিন ফ্রান্সে খুবই শীত পড়লো। শীতের জন্য বাইরের কাজকর্ম গেল থেমে। কাঠ কেটে আর আগের মতো রোজগার হয় না। অন্য কোন কাজও মিলছে না ভালজাঁর। অবস্থা দিন-দিন কঠিন হয়ে উঠলো। পর-পর কয়েকদিন ভালজাঁ কোন কাজ পেল না। এক টুকরো রুটি যোগাড় করাও কঠিন অবস্থা। না খেতে পেয়ে বোনের ছোট-ছোট ছেলেমেয়ে নির্জীবের মতো পড়ে রয়েছে। দরোজায়-দরোজায় ভালজাঁ সাহয্যের জন্য ছুটে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সবই নিস্ফল চেষ্টা।

রবিবারের সাপ্তাহিক ছুটির এক রাতে মহল্লার মনোহারী দোকানী সবেমাত্র দোকানপাট বন্ধ করে ঘুমাবার আয়োজন করছে–এমন সময় সে চমকে উঠলো। কি ব্যাপার! দোকানের পাশের কাঁচে কিসের যেন আওয়াজ হলো। দোকানী চুপি-চুপি পা টিপে-টিপে বেরিয়ে এলো শোবার ঘর থেকে। বেরিয়ে সে দেখতে পেলো দোকানের কাঁচের একটি বন্ধ জানালার কাছে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। জানালার কাঁচের একটি পাল্লা ভেঙ্গে ফেলেছে লোকটি। ফোঁকরের মধ্যে হাত দিয়ে সে একটি পাউরুটি বের করে নিল। তার হাত কাঁপছে। চারদিকে ভীত-চকতিভাবে তাঁকালো লোকটি, তারপর সে জোরে হাঁটতে শুরু করলো।

দোকানী চুপ করে দাঁড়িয়ে লোকটির কান্ড-কারখানা দেখছিল। লোকটি দোকান ছেড়ে পা বাড়াতেই চোর-চোর বলে চিৎকার করে তার পিছু পিছু ধাওয়া শুরু হলো দোকানীর। এদিকে লোকটিও দোকানীর হাঁকডাক শুনে ছুটতে শুরু করেছে। বার-বার সে হোঁচট খাচ্ছিলো। সে রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়লো। দোকানী দৌড়ে এসে লোকটির চুল চেপে ধরলো। লোকটি তার হাতের রুটি দূরে ছুরে ফেলে দিলো। ততক্ষণে সেখানে লোকজন এসে জমেছে। এদের মধ্য একজন বলল, — ব্যাটা কে হে, আচ্ছা শিক্ষা দিয়ে দাও ওকে!

সমানে কিলঘুষি পড়তে লাগলো। লোকটির ডান হাত দিয়ে তখনো রক্ত ঝরছে। কাঁচের জানালা ভাঙ্গতে গিয়ে তার হাত স্থানে-স্থানে কেটে গেছে। রক্তমাখা সেই হাত তুলে সে বললো, — আজ তিন চার দিন থেকে কিছু খেতে পাই নি। ঘরে সাতটি ছোট-ছোট ছেলে-মেয়ে। আমি তাদের বলেছি, আজ তাদের জন্য রুটি এনে দেবই।

তার কথায় কেউ কান দিল না। উল্টো আরও বেশি কিলঘুসি পড়তে লাগলো তার উপর। এ লোকটিই জাঁ ভালজাঁ।

আদালতে হাজির করা হলো ভালজাঁকে চুরি করার অপরাধে। তার সাশ্রম কারাদন্ড হলো পাঁচ বছরের।

ভালজাঁর স্বভাব ছিল অদ্ভুত। কোমলে-কঠোরে গড়া তার মন। খুব চিন্তিত থাকলেও তাকে দেখে তা বুঝা যেত না। সে যে খুব বেশি উদ্বিগ্ন আ বিষন্ন হয়ে পড়েছে, তাও কখনো মনে হতো না। মনে হতো, কোন কিছুতেই বুঝি তার উৎসাহ নেই। সাধারণ চেহারা, তাতে নেই কোন বুদ্ধির প্রতিফলন। কিন্তু কারাদন্ডের আদেশ শোনার সময় তার চোখ দুটো যেন একবার জ্বলে উঠেছিলো।

তুলোঁই কারাগারে পাঠানো হবে ভালজাঁকে ১৭৯৬ খ্রীষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে। কারাগারে পাঠানোর আগে ভালজাঁর শরীরে যখন লোহার বেড়ি পরিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, তখন আকুল কন্ঠে কেঁদে উঠেছিলো সেই গরিব। তার জীবনে যে দুর্যোগ নেমে এসেছে, তার ভয়াবহ পরিণতির কথা চিন্তা করে সে বারবার শিউরে উঠছিল। কান্নায় তার কন্ঠ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদতে-কাঁদতে সে বলেছিল, —সে সামান্য এক গরিব কাঠুরে। ফেবারুলে সে কাজ করতো। ভালজাঁ তার দান হাত শূন্যে উঠিয়ে কি যেন বলতে চাচ্ছিলো। শূন্যে অদৃশ্য বস্তুর উপর সে যেন হাত বুলাচ্ছে। মনে হচ্ছিলো, সে যেন সাতটি ছোট বড় ছেলেমেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে চাইছে, –আমি অন্যায় করেছি সত্যি, কিন্তু তা আমার নিজের জন্য নয়–অন্যায় করেছি আমার বনের সাতটি ক্ষুধার্ত অবুঝ ছেলেমেয়েদের জন্য।

সাতাশদিন পর তুলোই কারাগারে পৌছালো ভালজাঁ। গলায় লোহার শিকল, গায়ে লাল জামা। কয়েদি নং ২৪৬০১। জাঁ ভালজাঁর শুরু হলো কারা জীবন। ভালজাঁর বোনের কি অবস্থা হলো, আমরা কেউ তা জানি না। সহায় সম্বলহীন সাতটি ছেলেমেয়ে নিয়ে ভালজাঁর আশ্রয়কেই সে আঁকড়ে ধরেছিল। তার সে আশ্রয় টুটে গেল, তারা দেশান্তরী হলো। ভালজা সেটা জানতেও পারলো না –তারা কোথায় গেল।

কারাগারের কঠিন দেওয়ালে ভালজাঁর সব দুঃখ, বেদনা, কামনা, আর্তি মাথা কুটতে লাগলো। কারাগারের দেয়াল ভালজাঁর মনের দুয়ারও এঁটে দিতে লাগলো। মন থেকে তার বোন আর তার ছেলেমেয়েদের স্মৃতি মুছে যেতে লাগলো দিন-দিন।

কারাবাসের চতুর্থ বৎসর চলছে, ভালজাঁ খবর পেল, তার বোন তখন পুরনো প্যারিসে রয়েছে। প্যারিসের এক অতি সাধারণ বস্তিতে সে বাস করে। তার সাত ছেলেমেয়ের মধ্যে বড় ছেলেটির কোন খোজ-খবর নেই–জীবন সংগ্রামে ছ’টি ক্ষুদে ছেলেমেয়ে যে কথায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছে, তা’ কেও বলতে পারে না। কেবল ছোট ছেলেটি তার মায়ের কাছে থাকে। ছোট ছেলেটির বয়স তখন সাত বছর। ভালজাঁর বোন এক ছাপাখানায় কাজ করে। ছেলেটিকে ছাপাখানার পাশে একটি স্কুলে ভর্তি করে দেয়া হয়েছে।

বোনের খবর পেয়ে তার মনের মধ্যে পুরনো ব্যথা আবার মাথা চড়া দিয়ে উঠলো। কারাবাসের চতুর্থ বছরের শেষের দিকে সে কিছু কয়েদীদের সাহায্যে জেল থেকে পালালো। দুটো দিন সে ভীতসন্ত্রস্তভাবে এখানে-সেখানে সে পালিয়ে বেড়ালো। এই দু’দিন সে কিছু খাইনি, এক্টুও ঘুমায়নি। এই দুইদিন তার দারুণ ভয়ে-ভয়ে কেটে গেল। সামান্য শব্দ, কুকুরের ঘেউ-ঘেউ, ঘোরার ক্ষুরের আউয়াজ, উদগত চিমনীর ধোঁয়া– সব কিছুতেই সে সম্ভ্রস্ত উঠতো। অবশেষে পালানোর পর তৃতীয় দিন সন্ধায় সে ধরা পড়ে গেল। জেল থেকে পালানোর অপরাধে বিশেষ বিচার হলো তার।

কারাবাসের মেয়াদ আরো তিন বছর বাড়িয়ে দেওয়া হলো, সবমিলিয়ে তার মেয়াদ দাঁড়ালো আট বৎসর। ছ’বছরের মাথায় সে আবার পালাবার চেষ্টা করলো। কিন্তু সন্ধায় হাজিয়া ডাকার সময় রক্ষিরা টের পেয়ে গেল। কারাগারে পড়ে গেল পাগলা ঘন্টি, চললো খোঁজ। রাতের বেলাতেই ধরা পড়লো ভালজাঁ। সে এক জাহাজের মধ্যে লুকিয়ে ছিল; রক্ষিরা তার যখন ধরতে যায়, তখন সে আবার পালাবার চেষ্টা করে। কিন্ত নিরুপায় হয়ে সে প্রহরীদের হাতে ধরা দিতে বাধ্য হলো। বিচারে তার কারাবাসের মেয়াদ আরো পাঁচ বছর বাড়িয়ে দেওয়া হলো। এ ছাড়া বাড়তি শাস্তিস্বরুপ দুটি প্রকান্ড লোহার বেড়ি দু’বছরের জন্য তার গলায় পরিয়ে দেওয়া হলো।

কারাবাসের যখন দশ বছর চলছে, তখন তৃতীয়বার ভালজাঁ পালাবার চেষ্টা করলো। কিন্তু এবারও সে ধরা পরে গেল। শাস্তিস্বরুপ কারাবাসের মেয়াদ আরও তিন বছর বাড়িয়ে দেওয়া হলো ভালজাঁর। কারাবাসের ত্রয়দশ বছরে আবার পালাবার চেষ্টা করলো জাঁ ভালজাঁ। কিন্ত বরাবরের মতই এবারো ব্যার্থ হলো । পালানোর চারঘন্টার মাথায় রক্ষিদের হাতে ধরা পড়ে গেল সে। নিয়ম অনুযায়ী কারাবাসের মেয়াদ বাড়িয়ে দেওয়া হলো আরো তিন বছর। সব মিলিয়ে উনিশ বছর।

উনিশ বছর কারাবাসের পর ১৮১৫ সালে জেল থেকে বেরিয়ে এলো জাঁ ভালজাঁ। সে বেরিয়ে এলো নতুন এক অভিজ্ঞতা নিয়ে। ক্লান্তি আর আবসাদে তার আচ্ছন্ন দু’চোখ। তার মুখে গাম্ভীর্য, হৃদয়ে সমাজের উচুশ্রেনীর মানুষের প্রতি প্রবল ঘৃণাবোধ। ভালজাঁর বয়স তখন চল্লিশ। কারাগারে থাকাকালে ভালজাঁ লেখাপড়া শিখেছে। সে কয়েদীদের স্কুলে ভর্তি হয়েছিল।

(চলবে)

লা মিজারেবলঃ পর্ব-০২

টি মন্তব্য

You may also like...

Skip to toolbar