কোরিয়ান রুপকথা- সর্পকন্যা

কোরিয়া দেশের আকৃতি এমন যে, উপর থেকে দেখলে মনে হয় জাপান দ্বীপপুঞ্জের বুকে উঁচু করে ধরে রাখা হয়েছে একটা ছুরি। অনেক বছর আগের কথা, সেদেশে দুটো গ্রাম ছিল চুংশান লি এবং মিনদং লি। গ্রামদুটোর মাঝখান দিয়ে চলে গেছে বিশাল এক পাহাড়। আর পাহাড় জুড়ে ওকে আর পাইন গাছের গভীর জঙ্গল। সেই জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় বুনো জন্তরা গাছে গাছে উড়ে বেড়ায় পাখি। বুকে ভর দিয়ে চলাচল করে সাপের দল। অনেক সাপ এই জঙ্গলে কোনও কোনও সাপের বয়সে ঠিক নেই।

অনেক কিংবদন্তি রয়েছে এই সাপ সম্পর্কে। অনেকে বলে, এসব সাপ নাকি মেয়ে মানুষের রুপ ধরে ঘুড়ে বেড়ায়। অবশ্য অনেকেই বিশ্বাস করে না একথা। তবুও সাহসী লোকেরা পর্যন্ত এড়িয়ে চলে এই জঙ্গলের পথ। রাতের বেলা এদিক দিয়ে চলার কথা স্বপ্নেও ভাবে না কেউ।

চুংশান লি গ্রামের এক ছেলে হিয়োংখুন। বয়স ষোলো ওর। ‘মিনদং লি গ্রামে যাবি তুই,’ একদিন হিয়োং-এর বাবা ডেকে বললেন তাকে।

‘কেন?’ জিজ্ঞেস করল সে।

‘আমার ছোটবেলার এক বন্ধু আছে ওখানে,’ বাবা বললেন, ‘খুব ধনী। সবকিছুর উওরাধিকারিনী তার একমাত্র মেয়ে। প্রায় তোর বয়সী সে। তোরা যখন ছোট ছিলি, আমরা দু’বন্ধু মিলে ঠিক করেছিলাম তোদের বিয়ে দেব। এখন বিয়ের বয়স হয়েছে তোর। মেয়েটারও বিয়ের বয়স হয়েছে । দেরি করতে চাচ্ছি না আমি। তাই তোকে পাঠাতে চাচ্ছি মিনদং লি গ্রামে। আলাপ করে অয় ওদের সাথে। দেখে আয় মেয়েটাকেও।’

‘কবে যাব?’ বলল হিয়োং।

‘যত তাড়াতাড়ি যাওয়া যায়,’ বাবা বললেন।

একদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে ভাবী শ্বশুর বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিল হিয়াংখুন। মানুষ চলাচলের পথে গেলে পৌঁছতে সময় লাগবে তিনদিন। পাহাড়-জঙ্গলের পথে গেলে পরদিন সকালেই পৌঁছানো যাবে। তা ছাড়া এ পথে গিয়ে ওদের দেখানোও যাবে কত সাহস ওর।

খুবই সাহসী ছেলে হিয়োংখুন। অনেক ঘুরেছে সে পাহাড়-জঙ্গলের পথে। সুতরাং এ পথে যেতে ভয় করলো না তার। জোরে পা চালাল সে। পথে খাবার জন্য তার কাছে রয়েছে এক ব্যাগ সেদ্ধ আলু। এ ছাড়া কাঁধে রয়েছে এক বোঝা কাপড়। বন্ধু আর বন্ধু-পত্নীর জন্য কাপড়গুলো উপহার হিসেবে দিয়েছেন হিয়োং-এর বাবা।

ফুরফুরে মেজাজে পথ চলতে লাগল হিয়াং। বনের সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করল। সে এতটা আনমনা হয়ে পড়েছিল যে সরুপথটার দিকে আর খেয়াল রইল না। ফলে পাহাড়ি জঙ্গলে পথ হারাল সে।

ইতিমধ্য সূর্য ঢলে পড়ল পশ্চিম আকাশে। আর একটু পরে নামবে অন্ধকার। এখন পথের সন্ধান না পেলে অন্ধকারে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। পাগলের মত এদিক ওদিক ছোটাছুটি করলো হিয়োং। কিন্তু খুঁজে পেল না পথ। ঝপ করে অন্ধকার নেমে এল জঙ্গলে।

বন্যজন্তুদের চলাফেরার শব্দ শোনা যাচ্ছে। শিকারের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছে ওরা। ডেকে উঠছে মাঝে মাঝে। হিয়োং কি ওদের হাতে মারা যাবে? কিন্তু এভাবে মরবে না সে। একটা আশ্রয় তাকে খুঁজে বের করতেই হবে। একটা গাছের কোটর কিংবা পাহাড়ের গুহায় রাত কাটাতে পারে সে। ইতিমধ্যে চোখে সয়ে এসেছে অন্ধকার। আবছা দেখা যাচ্ছে সবকিছু। খুব সতর্কতার সাথে পা বাড়ালো সে।

মাঝরাতের দিকে দূরে একটা আলো দেখতে পেল হিয়োং। এগোল সেদিকে। একটু পর একটা ঘরের সামনে চলে এল। ঘরের জানালা দিয়ে আলো এসে পড়ছে বাইরে। স্বস্তির শ্বাস ফেলল সে যাক, একটা আশ্রয় পাওয়া গেছে।

এত রাতে বাড়ির লোকজনদের বিরক্ত করা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারল না হিয়াং। ইতস্তত করতে লাগল সে। কিন্তু বাইরে খুব ঠান্ডা । সহ্য করা যাচ্ছে না । তা ছাড়া যদি সাপ মেয়ে সত্যিই তাড়া করে তখন কি হবে? সুতরাং বাধ্য হয়েই বাড়ির দরজার দিকে এগুলো সে। ধাক্কা দিল বন্ধ দরজায়। কিছুক্ষন কোনও সাড়া পাওয়া গেল না। তারপর দরজা খুলে গেল। যে দরজা খুলল তাকে দেখে স্বস্তির শ্বাস ফেলল হিয়োং।

দরজা খুলেছে এক মাঝবয়সী মহিলা। মাথার কিছু কিছু চুল পাকা তার। মহিলা বলল, ‘তুমি কোথা থেকে এসেছ? যাবে কোথায়? ভেতরে এসো। বাইরে খুব ঠান্ডা, জমে যাবে তো।’

মহিলার কথায় আশ্বস্ত হলো হিয়োং, মহিলার পিছুপিছু ভিতরে ঢুকলো সে।

মেঝেটা ধুলোয় ভর্তি। এক কোণে হাঁটু মুড়ে বসল হিয়োং। কোনও বয়স্কা মহিলাকে সম্মান জানানোর এটাই রীতি।

‘বসো, আরাম করে বসো,’ নরম গলায় বলল মহিলা, ‘এত রাতে প্রচন্ড ঠান্ডার মধ্যে কি করছিলে জঙ্গলে? তোমার কি একটুও ভয় নেই?’

‘পথ হারিয়ে ফেলেছি আমি,’ বলল হিয়োং।

‘পথ হারিয়ে ফেলেছ?’ মহিলা বলল, ‘কিন্তু কেন এসেছিলে এপথে?’

হিয়োং খুলে বললো সব কথা। মন দিয়ে শুনল মনিলা, তারপর বলল, ‘খুব সাহসী ছেলে তুমি। গরম পানি এনে দিচ্ছি, হাত মুখ ধুয়ে নাও। তারপর খাবারের ব্যবস্থা করব তোমার।’

‘এতরাতে আমার জন্য কষ্ট করতে হবে না আপনাকে, ‘হিয়োং বলল, ‘থাকার জন্য একটু জায়গা পেলেই আমার চলবে।’

‘কি বলছ! মহিলা বলল। ‘আমার অতিথি তুমি। তোমার জন্য এটুকু করব না?’

হিয়োং বলল, ‘তা হলে গরম পানি দিলেই হবে। খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে না। খাবার আমার সঙ্গেই আছে।’

‘কি খাবার?’

‘সেদ্ধ আলু।’

‘আর কিছু লাগবে না?’

‘না’

একটু পরে মহিলা একটা বড় পাত্রে গরম পানি নিয়ে এলেন। ‘নাও, ভালো করে হাত মুখ ধুয়ে নাও। দরকার হলে আরও পানি দেওয়া যাবে।’

গরম পানি দিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে সেদ্ধ আলু খেতে লাগলো হিয়োংখুন।

মহিলা বলল, ‘আমার স্বামী শহরে মেলা দেখতে গেছে। ফিরবে কাল। সে ফিরবার আগেই আমার সেলায়ের কাজটা শেষ করতে হবে। কিছু লাগবে তোমার?’

‘না’

‘তাহলে আমি হাতের কাজটা সেরে ফেলি।’

মহিলা ঘরের অন্য কোণে সেলাইয়ের সরঞ্জাম নিয়ে বসলেন।

ভরপেট খাবার পর চোখের পাতা ভারী হয়ে এল হিয়োং-এর। দু’চোখে ঘুম নেমে এলো। ধকল ত কম যায়নি পাহাড় আর জঙ্গলের পথে হাঁটতে গিয়ে। দেয়ালে হেলান দিয়ে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল সে।

হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল তার। প্রথমে বুঝতে পারল না কোথায় রয়েছে সে। পরক্ষনে সব মনে পড়ল। দু’চোখ ডলে ঘরের চারদিকে তাকাল সে। যেন বদলে গেছে ঘরটা। সবকিছু কেমন অস্পষ্ট আর আবছা। মহিলা তখনও প্রদ্বীপের সামনে বসে একমনে সেলাই করে যাচ্ছে। তবে অনেক কমে গেছে তার বয়স। দারুন সুন্দরী লাগছে তাকে। মাথায় একটাও পাকা চুল নেই। একরাশ কালো চুল কোমর ছাড়িয়ে নেমে গেছে। সেলাই করার সময় নড়ছে তার হাত। সেই তালে দুলছে তার অপূর্ব দেহ সৌষ্ঠব।

অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো হিয়োং। না, ভুল দেখছে না সে। পালটে গেছে মহিলার চেহারা । বৃদ্ধা পরিণত হয়েছে যুবতীতে। হাসছে ঠোঁট টিপে।

ঘুম পুরোপুরি চলে গেছে হিয়োং-এর চোখ থেকে। মহিলাকে ভালো করে দেখার জন্য সামনে এগোল সে। আলাপ করার জন্য বলল, ‘এই পাহাড় আর জঙ্গলের দৃশ্য সত্যিই অপুর্ব সুন্দর।’

সুঁইয়ের সুতা শেষ হয়ে গিয়েছিল মহিলার। সুঁইয়ে নতুন সুতা পরানোর জন্য জিভ বের করলো মহিলা। সুতোর মাথাটা ভেজাল জিভ দিয়ে। চমকে উঠল হিয়োংখুন। আতঙ্কে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল তার শিরদাঁড়া বেয়ে। সে দেখল, মহিলাটির জিভ লম্বা আর সামনের দিকটা চেরা। একেবারে সাপের জিভের মত। ভয় পেল হিয়োং। বুঝতে পারল নিঝুম এই জঙ্গলে সর্পকন্যার কবলে পড়েছে সে। চিৎকার করতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল অনেক কষ্টে। বাঁচতে হলে পালাতে হবে তাকে। যেমন করে হোক পালাতে হবে এখান থেকে। হঠাৎ একটা বুদ্ধি এল মাথায়। বলল,’আমি–আমি একটু বাইরে যাব। ইয়ে –প্রকৃতির ডাকে।’

চোখ তুলে হিয়োং-এর দিকে তাকাল মেয়ে। দৃষ্টিতে ফুটে উঠল সন্দেহ। পরক্ষণে হেসে বলল, ‘ পেছনে দরজার ওপাশে ব্যবস্থা আছে। ওদিকে যাও।’

দরজার ওপাশে গিয়ে দৌড় শুরু করল হিয়োং। কোন দিকে যাচ্ছে জানে না সে। ছুটছে প্রানপণে। ছুটতে-ছুটতে এক পায়ের জুতো খুলে গেল। পাথরের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেল পা। তবু ছুটছে। গাছের কাঁটায় ছিঁড়ে গেল তার সুন্দর জামাকাপড়। গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ফেটে গেল তার কপাল। রক্ত ঝরতে লাগল। কিন্তু কোনদিকে খেয়াল নেই হিয়োং-এর। সে ছুটছে…। পিছনে শোনা যাচ্ছে শো-শো শব্দ। সর্পকন্যা তাড়া করেছে তাকে। সর্বনাশ! এখন কি করবে সে? হঠাৎ সামনে একটা ঘর দেখে থেমে পড়লো। ঘরের জানালা দিয়ে আলো এসে পড়েছে বাইরে। বুঝতে পারছে না এখানে আশ্রয় নেয়া নিরাপদ হবে কিনা।

ঘরের ভিতর থেকে ঘন্টার শব্দ আসছে। কিছুটা স্বাভাবিক হলো হিয়োং। ভাবল, পাহাড়-জঙ্গলের ভেতর কোন বৌদ্ধ মন্দির এটা। মন্দির হলে নিশ্চয় আশ্রয় মিলবে এখানে। আর সাপকন্যাও কোন ক্ষতি করতে পারবে না তার। ভাল করে ঘরটার দিকে তাকাল সে, পাথর আর কাঠ দিয়ে তৈরি। টালির ছাদ। দৌড়ে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দিল সে। চিৎকার করে বলল, ‘আমাকে বাঁচান… দরজা খুলুন।’

খুলে গেল দরজা। ওখানে এখানে একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুণী। হিয়োংকে ইশারায় ভেতরে ঢুকতে বললেন তিনি। ভেতরে ঢুকল হিয়োং।

ঘরের একপাশে কাঠের বেদি। বেদির উপর বুদ্ধের একটা ছোট মূর্তি। মূর্তির দু’পাশে দুটো মোমবাতি জ্বলছে। ভিক্ষণী বললেন, ‘তুমি কে? এই গভীর রাতে কোথা থেকে এসেছো তুমি?’

হিয়োং হাঁপাতে-হাঁপাতে বলল, ‘সে অনেক কথা, মা। সব বলব আপনাকে । আপাতত এটুকু বলছি, আমার নাম হিয়োংখুন। একটা সাপকন্যা তাড়া করেছে আমাকে। আপনি ওর হাত থেকে আমাকে বাঁচান।

‘সর্পকন্যার কবলে কি করে পড়লে?’ ভিক্ষুণী প্রশ্ন করলেন।

‘পথ হারিয়ে তার ঘরে আশ্রয় নিয়েছিলাম। বুঝতে পারিনি আমি। সে মেয়ে মানুষের রুপ ধরে ছিল।’

‘কিন্তু সে যে সর্পকন্যা বুঝলে কী করে?’

‘সে যখন…’

হিয়োংকে শেষ করতে না দিয়েই ভিক্ষুনী বললেন, ‘সে যখন সুঁইয়ে সুতা পরানোর সময় সুতোর মাথাটা জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নিচ্ছিল, তখন তুমি তার চেরা জিভটা দেখলে, তাই না?’

‘হ্যাঁ, ‘ আতঙ্কভরা গলায় বললো হিয়োং। ‘কিন্তু আপনি জানলেন কি করে?’

‘কি করে জানলাম?’ মুখ টিপে হেসে ভিক্ষুণী বেদিটার কাছে গেলেন। ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিলেন একটা মোমবাতির আলো চিৎকার করে উঠলো হিয়োংখুন। সে দেখলো, ভিক্ষুণী যখন মোমবাতিতে ফুঁ দিলেন, তখন তাঁর ছুঁচালো আর চেরা জিভটা বাইরে বেরিয়ে পড়ে নাচতে লাগলো বাতাসে। সঙ্গে-সঙ্গে নিভে গেল অপর মোমবাতিটিও। চারদিকে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। কেবল বাতাসে শোনা যেতে লাগল হিস্‌…হিস্‌…শব্দ।

*মূলঃ নাকচুয়াং পেক

ভাষান্তেরঃ মিজানুর রহমান কল্লোল

টি মন্তব্য

You may also like...

Skip to toolbar